অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, মঙ্গলবার, ২৬শে মে ২০২৬ | ১২ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


আরাফা দিবসের মহিমা, হজে না থাকা ব্যক্তি কী আমল করবেন?


বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬শে মে ২০২৬ বিকাল ০৪:৩০

remove_red_eye

৩১

আরাফা দিবসের গুরুত্ব ও ফজিলত

আরাফা দিবস ইসলামের এক মহিমান্বিত ও বরকতময় দিন। জিলহজ মাসের নবম দিনটি মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা ও ফজিলতের অধিকারী। এই দিনটি শুধু হজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশই নয়, বরং সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির এক অপূর্ব সুযোগ। আল্লাহ তাআলা মানবজীবনের সময়গুলোকে বিভিন্ন মর্যাদায় বিভক্ত করেছেন। বছরের কিছু দিন, কিছু রাত ও কিছু মাসকে তিনি বিশেষ সম্মান দান করেছেন। সেই বিশেষ দিনগুলোর মধ্যে আরাফার দিন অন্যতম।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতাআলা বারো মাসের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, এর মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। জিলহজ সেই সম্মানিত মাসগুলোর একটি। এই মাসেই হজ পালিত হয়, আর হজের মূল রোকন হলো আরাফায় অবস্থান। তাই আরাফা দিবসের গুরুত্ব ইসলামের ফরজ ইবাদতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আরাফা দিবসকে বছরের শ্রেষ্ঠতম দিনগুলোর একটি বলা হয়। আল্লাহ তাআলা সুরা ফজরে জিলহজের প্রথম দশ রাতের শপথ করেছেন, বেজোড় দিবস বা আরাফা দিবসেরও শপথ করেছেন, যা এই দিনটির বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন। হাদিসে এসেছে, ‘আরাফার দোয়া শ্রেষ্ঠ দোয়া।’ এ থেকে বোঝা যায়, এদিনে বান্দার দোয়া আল্লাহর দরবারে বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য হয়।

এই দিনটির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এই দিনেই ইসলাম ধর্মের পূর্ণতা ঘোষণা করা হয়। বিদায় হজের সময় আরাফার ময়দানে অবস্থানরত অবস্থায় আল্লাহ তাআলা সেই ঐতিহাসিক আয়াত নাজিল করেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনীত করলাম।’ এই আয়াত ইসলামের পরিপূর্ণতা ও চিরস্থায়ী সত্যতার ঘোষণা বহন করে। 

আরাফা দিবসের আরেকটি মহান বৈশিষ্ট্য হলো, এদিন আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। হাদিসে এসেছে, আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ সবচেয়ে বেশি মানুষকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেন। এই দিনে আল্লাহ বান্দাদের নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে তাদের নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন। মানুষ যখন ধূলিমলিন, অগোছালো অবস্থায় আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তখন আল্লাহ তাদের প্রতি বিশেষ রহমত বর্ষণ করেন।

আরাফা দিবসে হজে না থাকা ব্যক্তির আমল

হজ পালনকারীদের জন্য আরাফা দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ আরাফায় অবস্থান করা হজের প্রধান রোকন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আরাফাই হলো হজ।’ কেউ যদি আরাফায় অবস্থান করতে না পারে, তবে তার হজ বাতিল হয়ে যায়। সুতরাং এই দিনটি হাজিদের জন্য পুরো হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনটিকে হজের দিনও বলা হয়।

তবে আরাফার দিনের ফজিলত ও আমল শুধু হাজিদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্যও এই দিনটি অশেষ রহমতের। তাদের জন্য এই দিনের আমলের বিশেষ ফজিলত আছে। এখানে আমরা হজে না যাওয়া ব্যক্তির আরাফার দিনের কিছু আমল উল্লেখ করলাম।

১. আরাফার দিনের রোজা

হজে না যাওয়া ব্যক্তির জন্য আরাফার দিন রোজা রাখা সুন্নত ও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।’ অর্থাৎ এই একটি রোজার মাধ্যমে দুই বছরের ছোট গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এটি আল্লাহর অসীম দয়ার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

২. দোয়া, ইস্তেগফার ও জিকির

এদিন অধিক পরিমাণে দোয়া ও ইস্তেগফার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বান্দার উচিত এদিন নিজের অতীত জীবনের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দিন একটি জিকির বেশি বেশি পাঠ করতে উৎসাহ দিয়েছেন, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ইউহয়ী ওয়া ইউমিতু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদির।’ 

৩. কোরআন তিলাওয়াত ও আত্মশুদ্ধি

আরাফা দিবসে কোরআন তিলাওয়াতের গুরুত্বও অনেক বেশি। কোরআন মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি এনে দেয় এবং আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। এই দিনে কিছু সময় নির্জনে বসে কোরআন তিলাওয়াত, তাফসির পাঠ ও আল্লাহর জিকিরে মগ্ন থাকা মুমিনের অন্তরকে আলোকিত করে। দুনিয়ার ব্যস্ততা ও গাফলতি থেকে বের হয়ে এই দিনটি আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ বানানো উচিত।

৪. দান-সদকার মাধ্যমে বরকত অর্জন

এছাড়া দান-সদকার মাধ্যমে এই দিনের বরকত অর্জন করা যায়। ইসলাম মানুষকে শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতেই সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং সমাজের অসহায়, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছে। আরাফার দিনে দান-সদকা করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন। হাদিসে এসেছে, সদকা আল্লাহর ক্রোধ নিবারণ করে এবং বিপদ-আপদ দূর করে। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী গরিবদের সাহায্য করা, ক্ষুধার্তদের আহার করানো এবং অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো এই দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল।

৫. আত্মসমালোচনা ও নতুন জীবনের আহ্বান

বর্তমান যুগে মানুষ দুনিয়ার মোহ, ব্যস্ততা ও নানা পাপাচারে নিমজ্জিত। হৃদয়ে অস্থিরতা, জীবনে অশান্তি এবং আত্মিক শূন্যতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আরাফা দিবস আমাদের জন্য আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ। এই দিন মানুষ তার অতীত ভুলের জন্য অনুতপ্ত হতে পারে, নতুনভাবে আল্লাহর পথে ফিরে আসার অঙ্গীকার করতে পারে এবং ভবিষ্যৎ জীবনকে তাকওয়া ও নেক আমলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

একজন মুমিনের উচিত আরাফা দিবসকে অবহেলা না করা। বরং রোজা, নামাজ, দোয়া, ইস্তেগফার, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দান-সদকার মাধ্যমে দিনটি সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো। কারণ জীবনের প্রতিটি দিন আমাদের হাতে থাকে না, কিন্তু আল্লাহ কিছু বিশেষ মুহূর্তে আমাদের জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন। আরাফা দিবস সেই মহান সুযোগগুলোর অন্যতম।আরাফা দিবস আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা লাভ ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের দিন। এই দিনে আল্লাহর রহমত আসমান থেকে অবতীর্ণ হয়, বান্দার দোয়া কবুল হয় এবং অসংখ্য মানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে। তাই আমাদের সবার উচিত এই দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করা এবং আন্তরিক তওবা, ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করা।