অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শুক্রবার, ১০ই জুলাই ২০২৬ | ২৬শে আষাঢ় ১৪৩৩


মনপুরায় জনজীবন বিপর্যস্ত, পানিবন্দি ২০ হাজার মানুষ; রয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট


মনপুরা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০ই জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যা ০৭:১২

remove_red_eye

১১

মনপুরা প্রতিনিধি : ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় টানা আট দিনের বর্ষণে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও চরাঞ্চলের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কর্মহীন হয়ে পড়ায় নিম্নআয়ের বহু পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্যসংকট। দীর্ঘ সময় ধরে পানি আটকে থাকায় বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

শুক্রবার সকাল থেকে উপকূলজুড়ে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ঘর থেকে বের হতে না পারায় দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও দৈনন্দিন কাজকর্ম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

টানা বৃষ্টির কারণে কাজ করতে না পারায় দিনমজুর, জেলে, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। আয় বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারের চুলায় হাঁড়ি উঠছে না। খাদ্যসংকটে পড়া পরিবারগুলো দ্রুত শুকনো খাবার, চাল-ডাল ও বিশুদ্ধ পানির সহায়তা চেয়েছেন।



সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি চললেও পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেক পরিবারের ঘরের ভেতর ও উঠানে পানি জমে গেছে। কেউ কেউ ঘরের ভেতর উঁচু মাটির চুলা তৈরি করে রান্না করছেন, আবার অনেকে প্রতিবেশীর বাড়ি বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

উপজেলার সাকুচিয়া ইউনিয়নের খারির খাল এলাকা, মাস্টারহাট, লতাখালী ও বাতানখালী এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া বিচ্ছিন্ন কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর, কাজীরচর ও কলাতলী চরের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল তিন থেকে চার ফুট পানিতে ডুবে গেছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হতে পারছেন না।

দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুর গ্রাম ও দক্ষিণ সাকুচিয়া এলাকার বিভিন্ন গ্রামে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট ও চরযতিনের নিম্নাঞ্চল, সোনারচর গ্রামের পূর্ব ও পশ্চিম অংশেও পানি জমে রয়েছে। মূল ভূখণ্ডের পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলেও জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়েছে।

হাজিরহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা আনোয়ার, আল-আমিন ও আক্তার হোসেন; দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের ডা. কামাল ও শ্রীকৃষ্ণ; উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের রিপন ও হাসান; এবং মনপুরা ইউনিয়নের মমিন তালুকদার, জিসান চন্দ্রদাস ও শুভ্র বলেন, পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই চারপাশে বেড়িবাঁধের কাজ চলায় বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

তাদের অভিযোগ, উপজেলার বেশ কয়েকটি স্লুইসগেট অকেজো হয়ে আছে এবং বিভিন্ন খাল স্থানীয়ভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে বৃষ্টির পানি লোকালয়ে আটকে যাচ্ছে। দ্রুত স্লুইসগেট মেরামত, খাল পুনঃখনন ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।

জলাবদ্ধতার কারণে অনেক নলকূপের আশপাশ ডুবে গেছে। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী নারীদের নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবারগুলো।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা বলেন, সারাদেশের মতো মনপুরাতেও টানা বর্ষণের কারণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারও হাত নেই। তবে পানি নিষ্কাশনের কাজ চলমান রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত জরুরি ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইসগেট সংস্কার, খাল দখলমুক্ত করা এবং পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানান তারা।


মোঃ ইয়ামিন