অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল ২০২৬ | ১৭ই বৈশাখ ১৪৩৩


যে হাটে বিক্রি হয় মানুষের হাড়ভাঙা শ্রম


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০শে এপ্রিল ২০২৬ রাত ০৯:৩২

remove_red_eye

২৭

এআর সোহেব চৌধুরী, চরফ্যাশন থেকে: চরফ্যাশন উপজেলা শহরের হাটে বাজারে শ্রম বিক্রির জন্য আসেন চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষগুলো। তারা সবাই একত্রিত হয়ে অপেক্ষা করেন গায়ের ঘাম বিক্রির উদ্দেশ্যে। হাট বসলেই ছুটে আসেন এসব মানুষ। শত শত মানুষের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে শ্রম বিক্রির এই হাট। কারো কাঁধে খন্তা কোদাল আর ঝুড়িসহ কাজের বিভিন্ন সরঞ্জাম কিংবা ধান কাটার কাস্তে। এখানে বিক্রির জন্য কোনো পণ্য নেই, তবুও তীব্র দরদামে হাকডাকে সরগরম। কারণ এই হাটটিতে বিক্রি হয় মানুষের হাড়ভাঙা শ্রম আর গায়ের খাটুনি।
বছরের পর বছর ধরে চলছে মানুষ বিক্রির এই হাট। চরফ্যাশন উপজেলার প্রান্তিক জনপদের খেটে খাওয়া মেহনতি শ্রমিক বা দিনমজুরেরা কাজ খুঁজে পাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ কিংবা কৃষিকাজের জন্য সস্তায় শ্রমিক পান শত শত ক্রেতারা।
জানা যায়,এসব ধান কাটা,মাটি কাটা বা বাসাবাড়িতে নির্মাণ কাজসহ বিভিন্ন গৃহস্থলি কাজে এসব শ্রমিকের চাহিদা ও মূল্য উভয়ই কিছুটা বেশি। তাই উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল, মাদ্রাজ,আসলামপুর,ওমরপুর,এওয়াজপুর,নজরুল নগর,ঢালচর,কুকরি-মুকরি ও চরকলমীসহ বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে শতাধীক দিনমজুর বাড়তি আয়ের আশায় চরফ্যাশন সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গেট সংলগ্ন রাস্তায় হাটের দিনে ভিড় জমান। দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলে এই শ্রম বেচাকেনা। কৃষিশ্রমিক ও সাধারণ দিনমজুরসহ অন্যান্য কাজের শ্রমিকদের সবাই দরদামের মাধ্যমে নিজেদের শ্রম বিক্রি করেন। এসব শ্রমিকদের এখানে বিদেশি কামলা বলে। আর এই হাটকেও বিদেশি কামলার হাট হিসেবে চিনে।
কাজের ধরন ভেদে ৩বেলা খাওয়া ও নাস্তাসহ এই হাটে শ্রমের মূল্য ওঠানামা করে। বর্তমানে মাটি কাটা,কৃষি বা গৃহস্থালি কাজের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত  ৮০০থেকে ১০০০ টাকা চুক্তিতে বিক্রি হন এসব শ্রমিক। মাসিক চুক্তিতেও কাজ করেন এই শ্রমিকরা। আরও জানা যায়, প্রান্তিক অঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষ জীবিকার টানে ও অর্থের জোগান দিতেই এই হাটে গায়ের শ্রম বিক্রি করেন। কামলার হাটে এক শ্রেণির মানুষ আসেন বিক্রি হতে, অন্য শ্রেণির মানুষ আসেন শ্রম কিনতে। 
চলতে থাকে দরদাম, পণ্যের মতোই মৌসুম বিবেচনায় তাদের দামও ওঠানামা করে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে নিজেদের যেন এভাবেই বেচে দিচ্ছেন গ্রামের এই মেহনতি মানুষগুলো। এ হাঁটে নির্ধারিত সময়ের ভেতরেই প্রায় সবাই বিক্রি হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে অল্পসংখ্যক মানুষ অবিক্রিত থাকে। বিক্রি না হওয়া দিনটাতে কেউ কেউ আবার অন্য কাজ খোঁজেন, আবার কেউ কেউ বাড়ি চলে যান। জীবিকার ঘানি টানার তাগিদেই জীবন সংগ্রামের ঘাঁটি হিসেবে অনেকেই বেছে নিয়েছেন কামলা বিক্রির এই হাটকে।
 
মাটিকাটা শ্রমিক গ্রুপের সরদার আবুল হোসেন বলেন, তার বাড়ি চর মানিকার মাঝের চরে। ওই চরে এখনো মানুষের বসবাস গড়ে ওঠেনি। অল্প কিছু মানুষ চরে বাস করেন। যার ফলে নদীতে মাছ ধরা ছাড়া সেখানে তেমন কোনো কাজ নেই। একটু বাড়তি আয়ের আশায় তিনি এখানে চলে এসেছেন। মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন পূর্ব ঢাল চরের বাসিন্দা ষাটোর্ধ হায়াত আলী বলেন,   প্রতিদিনই শ্রম বিক্রির জন্য তিনি এই হাটে আসেন। মাঝেমধ্যে দু-এক দিন কাজ মিস হলেও মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার কাজ করেন তিনি। তার জীবনে তিনি অন্তত ১০বার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন। হারিয়েছেন ভিটেমাটি আর কৃষি জমি। তার গ্রামে মৎস্য শিকার ছাড়া আর কোনো কাজ না থাকায় তিনি মানুষের বাসাবাড়িতে মাটিকাটাসহ গৃহস্থালী যেকোনো কাজ করেন।
 
উপজেলার নজরুল নগর বাঁধের ঢালে বাস করা কর্মহীন শ্রমিক খায়ের মুন্সি বলেন, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় চালানোসহ ৩মেয়ে ও ১ছেলেকে নিয়ে তার সংসার চালানো ককষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। জীবনের শুরুতে তিনি মক্তবে পড়াতেন। বয়সের ভারে এখন চোখে ভালো দেখেন না। বাধ্য হয়েই দিনমজুরের কাজ করতে হয়। মেয়েদের বিয়ে ও ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তিনি তার গায়ের ঘাম আর শরীরের শক্তি বিক্রি করতে প্রতিদিন আসেন এই হাটে। 
আবদুল্লাহ নামের এক যুবক বলেন, আমি মূলত রাজ মিস্ত্রিদের হেল্পার হিসেবে কাজ করি। মাঝেমধ্যে কাজ না থাকলে এই হাটে আসি এবং যখন যেই কাজ পাই তাই করি। অভাব অনটনের সংসারে পড়ালেখা করতে পারিনি। বাবার মৃত্যুর পরে সংসারের হাল ধরেন আবদুল্লাহ। ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দিন চুক্তিতে কাজ করেন তিনি। 
পৌরসভা ১নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও  শ্রমিক কিনতে আসা শিক্ষক মনোয়ার হোসেন বলেন, বাসার মাটির নিচে পানির ট্যাংকি ও ঘরের পেছনে কিছু মাটি কাটার জন্য শ্রমিক কিনতে এসেছি। তাই এ মানুষ বিক্রির হাটে এসেছি। ১ হাজার টাকা রোজ চুক্তিতে একজন  ও ৮০০ টাকা করে দুইজন মাটিকাটার শ্রমিক নিলাম।
 
কাসেমগঞ্জের বাজার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন মিয়া মানুষ বিক্রির হাটে এসেছেন মাটি কাটার দিনমজুর কিনতে। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বরষা মৌসুমে তার পুকুরের পাড় ডুবে যায়। তাই পাড়ের মাটি উঁচু করতে মাটি কাটা শ্রমিক লাগবে। তাই ৮জন শ্রমিক নিয়েছি। পুরো দিন ১০০০টাকা করে ৩বেলা খাবারসহ নাস্তা দেয়া লাগবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুমানা আফরোজ বলেন,আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মে দিবসেই শুধু শ্রমিকদের সম্মান নিয়ে কথা বলা হয়। তাদের ন্যায্য মজুরি ও সঠিক কর্মঘন্টা এবং শ্রমিক মালিক সু-সম্পর্ক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে খেটে মেহনতি মজদুর মানুষের জীবনে দুঃখ দুর্দশা ও বঞ্চনা দূর হয় না। শ্রমিকদের শরীরের ঘাম কখনোই শুকায়না সবসময় ভেজা থাকে তাদের চোখের নোনা পানিতে। আর তাই আমাদের সকলের উচিত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম ও শোষণ বন্ধে মালিক শ্রমিকের সু-সম্পর্ক বাস্তবায়ন করা।