এইচ আর সুমন : বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সর্বোচ্চ গ্রেডের শিল্পীর মর্যাদা পেয়েছেন ভোলার কৃতি সন্তান ভোলার শুভ্রদেব খ্যাত বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী মনির চৌধুরী। এই অর্জনকে দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে সঙ্গীতাঙ্গনে নিরলস পথচলার স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন তাঁর শুভানুধ্যায়ী ও সঙ্গীতপ্রেমীরা।
ভোলা জেলা শহরের ওয়েস্টার্ন পাড়ার বাসিন্দা মনির চৌধুরী স্কুলজীবন থেকেই সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮১-৮২ সালে ভোলার ওস্তাদ শিল্পী কমলা দেবনাথ ও বুলু ঘোষের কাছে তাঁর সঙ্গীতে হাতেখড়ি। পরবর্তীতে তিনি বাবু গোপাল নাগের কাছে দীর্ঘ সময় সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। এছাড়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বর্তমানে সরকারের অতিরিক্ত সচিব অভিজিৎ চৌধুরীর কাছেও সঙ্গীতে তালিম নেন তিনি।
স্কুলজীবনে গান, হামদ-নাত, শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা, শিক্ষা সপ্তাহ, মৌসুমি প্রতিযোগিতা, গ্রন্থমেলা ও মিলাদুন্নবীসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে একাধিকবার প্রথম স্থান অর্জন করেন মনির চৌধুরী। ১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে ভোলা কলেজের সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় চারটি বিষয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি।
১৯৯৬ সাল থেকে ঢাকায় পেশাদারভাবে গান পরিবেশন শুরু করেন মনির চৌধুরী। ১৯৯৮ সালে তিনি বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হন এবং ২০০৬ সালে বিশেষ গ্রেডে উন্নীত হন। ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর ২০১৪ সালে উচ্চতর গ্রেডে উন্নীত হন। সম্প্রতি বিটিভির সর্বোচ্চ গ্রেডের শিল্পীর মর্যাদা লাভ করেছেন তিনি।
১৯৯৪ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, বাংলা খেয়াল, দেশাত্মবোধক গান ও রাধারমণের গানের ওপর প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে সনদ অর্জন করেন। পরে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রখ্যাত সঙ্গীতগুরু ওস্তাদ অনিল কুমার সাহার কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে তালিম গ্রহণ করেন।
দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে তিনি দেশের অসংখ্য বরেণ্য সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক ও শিল্পীর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন আজাদ রহমান, সমর দাস, অজিত রায়, আনোয়ার পারভেজ, আলী হোসেন, আলাউদ্দিন আলী, শেখ সাদী খান, সুজেয় শ্যাম, পুলক চৌধুরী, শাহে আলম বাদল, জালাল আহমেদ, সাদী মহম্মদ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, বাপ্পা মজুমদারসহ আরও অনেক গুণী সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। তাঁদের কাছ থেকে সঙ্গীতের বিভিন্ন দিক ও সূক্ষ্ম বিষয় শেখার সুযোগ হয়েছে বলে জানান তিনি।
গত প্রায় ৩০ বছরে বিটিভিসহ সরকারি ও বেসরকারি ২০টিরও বেশি টেলিভিশন চ্যানেলে তাঁর একক ও দ্বৈত সঙ্গীত পরিবেশিত হয়েছে। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের সকাল, দুপুর ও রাতের সরাসরি সঙ্গীত অনুষ্ঠানেও একাধিকবার গান পরিবেশন করেছেন তিনি।
সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবেও রয়েছে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসের (বাফা) ধানমন্ডি শাখায় শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সেন্ট্রাল বাফার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি সেন্ট্রাল বাফার চেয়ারম্যান ও ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মনির চৌধুরীর মোট ছয়টি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি মিক্সড অ্যালবাম এবং একটি মৌলিক অ্যালবাম। ২০০৯ সালে এটিএন মিউজিক থেকে প্রখ্যাত সুরকার মান্নান মোহাম্মদের সুরে তাঁর মৌলিক অ্যালবাম ‘প্রিয়া তোমায় ভুলিনি’ প্রকাশিত হয়।
সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও তাঁর সাফল্য রয়েছে। ২০১৭ সালে মাছরাঙা টেলিভিশনে প্রচারিত ঈদের ধারাবাহিক নাটক ‘হিরো ভাইয়ের হিরোইন’-এর শিরোনাম গানের সুর, সঙ্গীত পরিচালনা ও কণ্ঠ দেন তিনি। নাটকটির শিরোনাম গান দর্শকমহলে জনপ্রিয়তা লাভ করে।
২০০৬ সালে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে সুরধুনীর আয়োজনে প্রায় ১ হাজার ২০০ দর্শকের উপস্থিতিতে তাঁর একক সঙ্গীত সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়। একই বছর বেঙ্গল ফাউন্ডেশনেও তাঁর একক সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়। ২০১৯ সালে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে ভারতীয় হাইকমিশনের আয়োজনে প্রায় এক হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে তাঁর একক সঙ্গীত সন্ধ্যা অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন মনির চৌধুরী। ২০০৮ সালে বিখ্যাত সুরকার মধু মুখার্জির সুরে অ্যালবাম তৈরির জন্য কলকাতায় যান তিনি। ২০১৯ সালে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায় একটি অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন। একই বছরের নভেম্বরে ভারতের দিল্লিতে আন্তর্জাতিক বাংলা ভাষা সংস্কৃতি সমিতির আয়োজনে সাহিত্য ও সঙ্গীত সম্মেলনে অংশ নিয়ে প্রশংসা অর্জন করেন। পরে কলকাতার একটি সঙ্গীত অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেন তিনি।
২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে এনটিভি দর্শক ফোরামের আয়োজনে ‘বিজয় উৎসব’ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সঙ্গীতানুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করেন এই শিল্পী। সেখানে তাঁর পরিবেশনা প্রশংসিত হয়।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও মে মাসে গীতিকার চৌধুরী নাজমুল হকের কথায় এবং মনির চৌধুরীর সুরে দুটি নতুন গান প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয়া ভৌমিকের কণ্ঠে ‘হয়নি মনে একটি বারও আমায় ভুলে গিয়েছো’ এবং অর্পা দের কণ্ঠে ‘দেখি সারাবেলা’ শিরোনামের গান দুটি ইউটিউবে প্রকাশের পর শ্রোতাদের প্রশংসা পাচ্ছে।
মনির চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিনের সঙ্গীতসাধনার স্বীকৃতি হিসেবে বিটিভির সর্বোচ্চ গ্রেডের শিল্পীর মর্যাদা পাওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের। ভবিষ্যতেও তিনি সঙ্গীতচর্চার মাধ্যমে দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে চান।
তিনি জানান, সামনে তাঁর সুরে বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে আরও বেশ কয়েকটি মেলোডি গান প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।