বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ সন্ধ্যা ০৬:২৯
১৬
যারা আলো জ্বালিয়ে যান, তারা কখনও পুরোপুরি চলে যান না
আনজামুল আলম মুনীর : কোনো কোনো মানুষের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক হয়ে থাকে না; তা একটি জনপদের বিবেককে নীরব করে দেয়। এমন মানুষদের জীবনকে সময়ের ক্যালেন্ডার দিয়ে মাপা যায় না, কারণ তাঁদের প্রকৃত পরিচয় বয়সে নয়, মানুষের জীবনে রেখে যাওয়া আলোর পরিমাণে নির্ধারিত হয়। শেখ ফরিদ উদ্দিন আহমেদের অকালপ্রয়াণ সেই ধরনের এক বেদনাদায়ক ঘটনা। তিনি হয়তো জাতীয় রাজনীতির আলোচিত মুখ ছিলেন না, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করেননি, কিংবা নিজের নাম প্রচারের জন্য কোনো মঞ্চ নির্মাণ করেননি। কিন্তু ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মুন্সিরহাট গ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি যে জীবনদর্শন নির্মাণ করেছিলেন, তা আজকের বাংলাদেশে উন্নয়ন, মানবাধিকার, পরিবেশ, কৃষি ও মুক্তচিন্তার আলোচনায় এক অনিবার্য প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
একটি সমাজের প্রকৃত শক্তি তার রাজধানীতে নয়, তার প্রান্তিক জনপদে লুকিয়ে থাকে। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বড় পরিবর্তনের বীজ অনেক সময় ছোট গ্রামের উঠোনে, একটি পাঠাগারের ধুলোমাখা বইয়ের তাকে, কিংবা একজন নীরব সংগঠকের নিরলস পরিশ্রমে জন্ম নেয়। শেখ ফরিদের জীবন সেই সত্যেরই পুনরাবৃত্তি। আধুনিকতার মোহে শহরমুখী না হয়ে তিনি নিজের গ্রামকেই গড়ে তুলেছিলেন চিন্তা, প্রকৃতি ও কর্মের মিলনস্থলে। তাঁর জীবনসঙ্গী কবি হুমায়ারা সুরভীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যে বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি ছিল শুধু একটি বাসভবন নয়; সেটি ছিল এক অর্থে একটি মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে ছিল বিশাল গ্রন্থাগার, গবেষণার পরিবেশ, কৃষিভিত্তিক জীবনচর্চা, গবাদিপশুর খামার, কবুতরের খামার, শাকসবজির বাগান, ফল ফসলের বাগান। বিশেষ করে নারিকেল বাগান - যেখানে উন্নয়নকে ভোগের ভাষায় নয়, সৃষ্টির ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল।
আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এই যে, আমরা উন্নয়নের সংজ্ঞাকে ক্রমশ কংক্রিটের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি। বহুতল ভবন, উজ্জ্বল সড়ক, বাজারের প্রসার কিংবা প্রযুক্তির বিস্তারকে উন্নয়নের একমাত্র সূচক হিসেবে দেখতে দেখতে আমরা ভুলে যাই যে, একটি সমাজ তখনই সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়, যখন তার মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে, প্রকৃতিকে রক্ষা করতে শেখে, নিজের অধিকারের ভাষা অর্জন করে এবং পরস্পরের প্রতি দায়বদ্ধতার বোধ গড়ে তোলে। শেখ ফরিদের জীবন এই বিকল্প উন্নয়নদর্শনের এক নীরব ভাষ্য।
প্রায় তিন দশক আগে তিনি 'মাই রাইট' নামে একটি উন্নয়ন উদ্যোগ গড়ে তুলেছিলেন। সেই প্রতিষ্ঠান কত দূর বিস্তৃত হয়েছিল, তার আনুষ্ঠানিক নথিপত্র ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ভবিষ্যতে সংরক্ষণের দাবি রাখে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট - তিনি মানুষের জন্মগত ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝতেন, অধিকার কেবল আইনের বইয়ে লেখা একটি শব্দ নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। একজন কৃষকের ন্যায্য মূল্য, একজন শ্রমজীবীর মর্যাদা, একজন নারীর সম্মান, একজন শিশুর শিক্ষা এবং একজন নাগরিকের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ - এসবই অধিকারচর্চার বাস্তব রূপ।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন যেমন প্রান্তিক মানুষের জীবনকে সংবাদপত্রের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন, তেমনি শেখ ফরিদ নিজের জনপদের ভেতরে দাঁড়িয়ে মানুষের জীবনকে পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। দুজনের কাজের ধরন আলাদা, সময় আলাদা, পরিসর আলাদা। তবু তাঁদের মধ্যে একটি গভীর মিল রয়েছে - দুজনই বিশ্বাস করতেন, মানুষের কাছে না গেলে মানুষকে বোঝা যায় না। এই দর্শনই তাঁদের আলাদা করে। মোনাজাতউদ্দিন মেঠোপথে হেঁটে মানুষের গল্প সংগ্রহ করতেন; শেখ ফরিদ সেই মানুষের সঙ্গে মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন নির্মাণ করতেন। একজন সংবাদ লিখতেন, অন্যজন সমাজকে সংগঠিত করার চেষ্টা করতেন। দুজনের পথ আলাদা হলেও গন্তব্য ছিল মানুষের মর্যাদা।
এই দর্শনের শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। কাঙাল হরিনাথ যেমন 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা'র মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষের কণ্ঠকে ইতিহাসে স্থান দিয়েছিলেন, তেমনি বিশ্বের অন্য প্রান্তে ওয়াঙ্গারি মাথাই গাছ লাগানোর আন্দোলনকে মানবাধিকারের ভাষায় রূপ দিয়েছিলেন। জেন অ্যাডামস শিখিয়েছিলেন, সমাজকে বদলাতে চাইলে মানুষের সঙ্গে বসবাস করতে হয়। শেখ ফরিদের জীবনকে এই মহান ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তুলনা করে তাঁর অবদানের পরিধি সমান বলে দাবি করা সমীচীন নয়; কিন্তু তাঁদের জীবনদর্শনের আলোয় তাঁর কাজকে দেখলে বোঝা যায়, পৃথিবীর যেখানেই মানুষ সত্যিকার অর্থে সমাজ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে, সেখানেই স্থানীয় বাস্তবতা, মানুষের অংশগ্রহণ এবং নৈতিক সাহস ছিল প্রধান ভিত্তি।
শেখ ফরিদের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তাঁর পরিবেশচিন্তা। আজ যখন জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির সংকট, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং খাদ্যনিরাপত্তা বিশ্বজুড়ে বড় আলোচ্য বিষয়, তখন তাঁর নারিকেলবাগান, কৃষিভিত্তিক জীবনচর্চা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের প্রচেষ্টা নতুন অর্থ পায়। তিনি হয়তো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দেননি, কিন্তু নিজের উঠোনেই এমন একটি জীবনচর্চার অনুশীলন করেছিলেন, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় - প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু গাছ লাগানো নয়; প্রকৃতির সঙ্গে দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা।
মঙ্গলবার সকাল। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন শেখ ফরিদ। তাঁকে দ্রুত বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলো। কিন্তু ততক্ষণে তিনি চলে গেছেন। দুপুরে যখন তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেলাম, তখন আমরা কয়েকজন সতীর্থ বন্ধু বরিশালে একটা প্রশিক্ষণে ব্যস্ত ছিলাম। মুহূর্তের জন্য সব হিসাব এলোমেলো হয়ে গেল। মনে হলো, যারা সমাজকে কিছু দিতে চায়, যারা মানুষের অধিকারের কথা বলে, যারা নীরবে আলো জ্বালিয়ে যায় - তারা এত তাড়াতাড়ি চলে যায় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো মানুষের কাছে নেই। কিন্তু এই প্রশ্ন আমাদের একটি দায়িত্বের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
একজন মানুষের মৃত্যুর পর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরু হয় জীবিতদের। তাঁর গ্রন্থাগার কি টিকে থাকবে? তাঁর স্বপ্ন কি নথিবদ্ধ হবে? তাঁর প্রতিষ্ঠিত উদ্যোগ কি নতুন নেতৃত্ব পাবে? তাঁর সন্তান কি বাবার আদর্শের গল্প শুনে বড় হবে? তাঁর জীবনসঙ্গী হুমায়ারা সুরভী কি একা এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবেন, নাকি সমাজ তাঁর পাশে দাঁড়াবে? এই প্রশ্নগুলো শুধু একটি পরিবারের নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক বিবেকের প্রশ্ন।
আমাদের দেশে অসংখ্য স্থানীয় গুণীজন আছেন, যাঁরা প্রচারের আলোয় আসেন না। তাঁদের কাজের নথি থাকে না, জীবনী লেখা হয় না, স্মৃতি সংরক্ষিত হয় না। ফলে তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি সময়ের ইতিহাসও। শেখ ফরিদের জীবন আমাদের শেখায়, প্রান্তিক মানুষের ইতিহাস সংরক্ষণ করাও একটি সামাজিক দায়িত্ব। তাঁর বন্ধু, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও পরিবারের সদস্যদের স্মৃতি সংগ্রহ করে একটি মৌখিক ইতিহাস তৈরি করা, তাঁর গ্রন্থাগার সংরক্ষণ করা, তাঁর কাজের দলিলপত্র নথিবদ্ধ করা - এসবই হতে পারে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।
শেষ পর্যন্ত ফিরে আসি সেই পঙ্ক্তির কাছে, যা আজ তাঁর স্মৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেছে -
'মানুষ হতে মানুষ আসে, বিরুদ্ধতার ভিড় বাড়ায়; তুমিও মানুষ, আমিও মানুষ, তফাৎ শুধু শিরদাঁড়ায়।'
শিরদাঁড়া এখানে কেবল শরীরের অঙ্গ নয়; এটি নৈতিক সাহসের প্রতীক। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার প্রতীক। নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার প্রতীক। শেখ ফরিদের জীবনকে যদি একটি বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তবে বলা যায় - তিনি শিরদাঁড়া নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি দেখিয়ে গেছেন, একটি গ্রাম থেকেও বিশ্বমানের চিন্তা করা যায়; প্রচার ছাড়াও মানুষের জন্য কাজ করা যায়; একটি বাড়িকেও জ্ঞানের আশ্রমে পরিণত করা যায়।
মানুষ একদিন চলে যায়। তাঁর কণ্ঠ থেমে যায়, তাঁর পদচিহ্ন মুছে যায়, তাঁর প্রিয় উঠোনে অন্য রকম নীরবতা নামে। কিন্তু তিনি যদি মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এবং মানবিক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন জাগিয়ে দিয়ে যেতে পারেন, তাহলে তাঁর মৃত্যু শেষ কথা হয়ে থাকে না। তখন তিনি বেঁচে থাকেন মানুষের কাজে, মানুষের স্মৃতিতে এবং মানুষের শিরদাঁড়ায়।
শেখ ফরিদ উদ্দিন আহমেদকে তাই বিদায় নয় - শ্রদ্ধা। তাঁর স্বপ্নের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার অঙ্গীকারই হোক আমাদের প্রকৃত প্রণাম।
ভোলায় নজরুল বর্ষ উপলক্ষে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত, পাঁচ বিভাগে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা
ভোলায় যুবদলের বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত
মনপুরায় টাকার বিনিময়ে মা ইলিশ শিকার, মৎস্য কর্মকর্তার কল রেকর্ডিং ভাইরাল
লালমোহনে সড়ক দুর্ঘটনায় মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধের মৃত্যু
মনপুরায় ট্রলার বোঝাই ১৩ মণ মা ইলিশ জব্দ
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
ভবিষ্যতের সব নির্বাচন একই মানদণ্ডে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে ইসি : সিইসি
বিদ্যুৎখাতে লুটপাট করতেই দায়মুক্তি আইন পাস করেছিল আওয়ামী লীগ: রিজভী
সাইবার হামলার আতঙ্কে বন্ধ এনআইডি সার্ভার
ভোলায় বিষের বোতল নিয়ে বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকা
ভোলায় পাঁচ সন্তানের জননীকে গলা কেটে হত্যা
উৎসবের ঋতু হেমন্ত কাল
ভোলার ৪৩ এলাকা রেড জোন চিহ্নিত: আসছে লকডাউনের ঘোষনা
ভোলায় বাবা-মেয়ে করোনায় আক্রান্ত, ৪৫ বাড়ি লকডাউন
ভোলায় এবার কলেজ ছাত্র হত্যা, মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার
ঢাকা-ভোলা নৌ-রুটের দিবা সার্ভিসে যুক্ত হলো এমভি দোয়েল পাখি-১র
কাশফুল জানান দিচ্ছ বাংলার প্রকৃতিতে এখন ভরা শরৎ
জাতীয় সংসদে জাতির পিতার ছবি টানানোর নির্দেশ
ভোলায় আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস পালিত