অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, মঙ্গলবার, ৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৪শে ভাদ্র ১৪৩৩


ভোলায় সারের বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ ১৮দফা দাবি বাস্তবায়নে স্মারকলিপি


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ০৯:৪৮

remove_red_eye

৫৪

নেয়ামত উল্যাহ: ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার কৃষকদের ক্রমবর্ধমান সারের চাহিদা বিবেচনায় টিএসপি, ডিএপি, ইউরিয়া ও এমওপি সারের সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশন। একই সঙ্গে দেশব্যাপী সার সরবরাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, ডিলার সিন্ডিকেট ও মজুতদারি রোধ, সার পাচার ও কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়নমূলক সভাগুলোতে কৃষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহাবউদ্দীন ফরাজীর স্বাক্ষরিত পৃথক আবেদন ও স্মারকলিপি ভোলার জেলা প্রশাসক, কৃষিমন্ত্রী এবং জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া আবেদনে বলা হয়, ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর জেগে ওঠা চরাঞ্চল এবং আগে অনাবাদী থাকা বিস্তীর্ণ জমিতে গত কয়েক বছরে রবি ও খরিপ-২ মৌসুমে কৃষি আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব জমিতে আগাম ক্যাপসিকাম, শসা, চিচিঙ্গা, করলা, তরমুজ, আলু, পেঁয়াজ, সয়াবিন, সরিষাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ফসলের চাষ বাড়ায় সারের চাহিদাও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ভোলা সদর ও দৌলতখান নয়, চরফ্যাশন, লালমোহন ও বোরহানউদ্দিন উপজেলার অনেক কৃষকও এসব চরাঞ্চলে চাষাবাদ করছেন।
আবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমান সরকারি বরাদ্দ প্রকৃত চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় অতীতে অনেক কৃষককে অন্য জেলা থেকে বেশি দামে সার কিনতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। সময়মতো পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিত না হলে কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই প্রকৃত আবাদি জমি, ফসলের ধরন ও কৃষকের সংখ্যা বিবেচনায় উপজেলাভিত্তিক সারের বরাদ্দ পুনর্র্নিধারণের দাবি জানানো হয়।
কৃষিমন্ত্রীর কাছে দেওয়া স্মারকলিপিতে দেশব্যাপী সার সংকট নিরসন, সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রি নিশ্চিত করা, ডিলার সিন্ডিকেট ও মজুতদারি প্রতিরোধ, নকল-ভেজাল সার, বীজ ও কীটনাশকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হাইব্রিড বীজের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়। এতে বলা হয়, অনেক এলাকায় কৃষকেরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং সময়মতো সার প্রয়োগ না হওয়ায় ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিন সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৮ দফা দাবি-সংবলিত লিফলেটও বিতরণ করা হয়। দাবির মধ্যে রয়েছে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ, নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ডিলারদের জবাবদিহি, নকল ও ভেজাল কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে অভিযান, কৃষি কর্মকর্তাদের আইনগত ক্ষমতা জোরদার, কার্যকর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধে লাইসেন্স বাতিল।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর কাছে দেওয়া পৃথক আবেদনে জেলা ও উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভাসহ কৃষি ও খাদ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা সভায় কৃষক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। আবেদনে বলা হয়, মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, কৃষিঋণ, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষি অবকাঠামোসংক্রান্ত নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তাঁদের মতামত উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, হিমাগার ও গুদাম সুবিধা বৃদ্ধি, সরাসরি বাজারজাতকরণ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন এবং কৃষক-প্রশাসন সমন্বয় ব্যবস্থা গঠনের দাবিও জানানো হয়।
স্মারকলিপি প্রসঙ্গে ভোলার জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, জেলায় সারের কোনো সংকট নেই। কৃষক প্রতিনিধিদের দেওয়া স্মারকলিপি কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা গ্রহণযোগ্য মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রস্তুত হয়নি। কোথায়, কোন এলাকায় বা কোন কৃষক সার পাচ্ছেন না, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য সেখানে উল্লেখ করা হয়নি। চরফ্যাশনের কৃষকেরা ভোলা সদরে এসে সার নিচ্ছেন, এমন অভিযোগ থাকলে সেটি কৃষি বিভাগকে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, স্মারকলিপি দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের দৃষ্টিতে অনেকটা ‘পাবলিসিটি স্টান্ট’। অনেক কৃষক মনে করেন বেশি সার ব্যবহার করলে বেশি ফলন পাওয়া যাবে। বাস্তবে নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত সার প্রয়োগে বাড়তি সুফল মেলে না। সরকার ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে, তাই অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার বা অপচয়ের কোনো যৌক্তিকতা নেই।
জেলা প্রশাসক বলেন, সারের চাহিদা নিরূপণ ও বরাদ্দ নির্ধারণ একটি বৈজ্ঞানিক বিষয়। এটি কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীরাই তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নির্ধারণ করেন। শুধু দাবির ভিত্তিতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব নয়। তবে প্রাপ্ত স্মারকলিপিটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের (ডিডি) কাছে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহাবুদ্দীন ফরাজী বলেন, ভোলা থেকে নদী ও সাগরপথে ট্রলারে সার পাচার হচ্ছে, এটি বন্ধ করতে হবে। চরাঞ্চলে কৃষির ব্যাপক সম্প্রসারণ হলেও সেই অনুপাতে সারের সরকারি বরাদ্দ বাড়েনি। কৃষকদের স্বার্থে বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সার সরবরাহে স্বচ্ছতা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জেলা আহ্বায়ক জাকির হোসেন মনসুর, জেলা সদস্যসচিব মামুন শেখ, জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হাসান কেরানী, সদর উপজেলা আহ্বায়ক হাজী আবদুল মান্নান, উপজেলা সদস্যসচিব আবু বকর সিদ্দিকসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতাকর্মী।