অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, বুধবার, ২৮শে অক্টোবর ২০২৬ | ১২ই কার্তিক ১৪৩৩


প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে চ্যালেঞ্জের মুখে চরফ্যাশনে বাঁশ পণ্যের কুটিরশিল্প


চরফ্যাসন প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭শে অক্টোবর ২০২৬ রাত ১১:২০

remove_red_eye

১৬

এআর সোয়েব চৌধুরী, চরফ্যাশন থেকে : একসময় গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য অংশ ছিল বাঁশের তৈরি নানা সামগ্রী। মাছ ধরার ফাঁদ, শস্য সংরক্ষণ, ঝাড়াই-বাছাই ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত এসব পণ্য এখন প্লাস্টিকের বিকল্পের চাপে পিছিয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে বাঁশের মূল্যবৃদ্ধি ও পুঁজি সংকট যুক্ত হওয়ায় চরফ্যাশনের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পটি টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে পড়েছে।
চরফ্যাশন পৌরসভার কালীবাড়ি গেটসংলগ্ন সদর সড়কে ব্যবসায়ীরা মাছ ধরার ফাঁদ, চাই, পলো, কুলা, চালুনি, ঝুড়ি, ডালা, ডুলা, মুরগি ও পাখির খাঁচা, চাটাই, মোড়া, চালনিসহ এবং গৃহস্থালির বিভিন্ন বাঁশজাত সামগ্রী বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।  গ্রামীণ এলাকায় এসব পণ্যের ব্যবহার থাকলেও প্লাস্টিকের সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম দামের কারণে বাঁশের পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে।
বাঁশের দাম, পরিবহন ও শ্রমমূল্য বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু বাজার প্রতিযোগিতা ও ক্রেতাদের সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে পারছেন না। ফলে বিক্রি করেও প্রত্যাশিত লাভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
চরফ্যাশন সদর সড়কের বাঁশপণ্যের ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, “বাঁশ কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা লাগে। পরিবহন খরচও দিতে হয়। কিন্তু ক্রেতারা পণ্যের দাম বেশি শুনলে কিনতে চান না। সব খরচ বাদ দিয়ে আগের মতো লাভ করা এখন কঠিন।
ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্লাস্টিকের বিভিন্ন সামগ্রী বাজারে সহজেই পাওয়া যায়। অনেক ক্রেতা কম দামের কারণে সেগুলো কিনছেন। বাঁশের পণ্য তৈরি করতে শ্রম ও সময় দুটোই বেশি লাগে। তারপরও বিক্রি ধরে রাখতে আমাদের দাম নিয়ে হিসাব করতে হয়।
আরেক ব্যবসায়ী কামাল বলেন, এই ব্যবসার ওপর নির্ভর করেই আমাদের সংসার চলে। কিন্তু পুঁজি কম থাকায় বেশি পণ্য কিনে রাখা যায় না। সহজ শর্তে ঋণ ও বাঁশের সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসাটা ভালোভাবে চালানো সম্ভব হতো।”
বাঁশের পণ্যের বাজারে ক্রেতাদের চাহিদা ও পছন্দের পরিবর্তনও প্রভাব ফেলছে। দৈনন্দিন ব্যবহারের অনেক সামগ্রীতে প্লাস্টিকের বিকল্প চলে আসায় বাঁশের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে কেউ কেউ প্রয়োজন ও দাম বিবেচনা করছেন।
ক্রেতা শাহেব আলী বলেন, “বাঁশের তৈরি পণ্য গ্রামবাংলার ঐতিহ্য। মাছ ধরার সরঞ্জামসহ কিছু কাজে এসব পণ্য এখনো প্রয়োজন হয়। তবে দাম সাধ্যের মধ্যে থাকলে মানুষ আরও বেশি কিনতে আগ্রহী হবে।
আরেক ক্রেতা মো. সুমন বলেন, প্লাস্টিকের অনেক পণ্য কম দামে পাওয়া যায় বলে মানুষ সেগুলোর দিকে ঝুঁকছে। তবে বাঁশের তৈরি পণ্যেরও আলাদা প্রয়োজন রয়েছে। এসব পণ্য টিকিয়ে রাখতে মান ভালো রাখার পাশাপাশি দামও ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে রাখা দরকার। এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ, নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক বিপণনব্যবস্থা জরুরি। সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ বা ঋণ কার্যক্রম রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সহায়তা পেলে ব্যবসায়ীরা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন।
শীল্প উদ্যোক্তা হেমায়েত উদ্দিন গোলাপ বলেন,
বাঁশের তৈরি পণ্য গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব পণ্যের ব্যবহার ধরে রাখা গেলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কারিগরদের কর্মসংস্থান রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের সুযোগও বাড়বে।
চরফ্যাশনের কালীবাড়ি গেটসংলগ্ন সদর সড়কে সাজানো বাঁশের পণ্যগুলো স্থানীয় কুটির শিল্পের জীবন্ত নিদর্শন। পরিকল্পিত সহায়তা, কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা রক্ষা এবং গ্রামীণ ঐতিহ্য সংরক্ষণ দুটিই সম্ভব হবে।